দারসুল কোরআন

1

সুরা যুমর দারস

মোট আয়াত: ৭৫টি

মোট ৮টি রুকু আছে।

২৩ ও ২৪ নম্বর পারা

ওহীর ধারাবাহিকতায়ঃ৫৯ নং সুরা

কোরআন বিন্যাস অনুযায়ীঃ ৩৯ নং সুরা

সহীহ তেলোয়াতঃ ২২ ও ২৩ আয়াত

﴿أَفَمَن شَرَحَ اللَّهُ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ فَهُوَ عَلَىٰ نُورٍ مِّن رَّبِّهِ ۚ فَوَيْلٌ لِّلْقَاسِيَةِ قُلُوبُهُم مِّن ذِكْرِ اللَّهِ ۚ أُولَٰئِكَ فِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ﴾ ﴿اللَّهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كِتَابًا مُّتَشَابِهًا مَّثَانِيَ تَقْشَعِرُّ مِنْهُ جُلُودُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ ثُمَّ تَلِينُ جُلُودُهُمْ وَقُلُوبُهُمْ إِلَىٰ ذِكْرِ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكَ هُدَى اللَّهِ يَهْدِي بِهِ مَن يَشَاءُ ۚ وَمَن يُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ﴾

২২) আল্লাহ তা’আলা যে ব্যক্তির বক্ষ ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন এবং যে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত আলোতে চলছে সেকি (সে ব্যক্তির মত হতে পারে যে এসব কথা থেকে কোন শিক্ষাই গ্রহণ করেনি?) ধ্বংস সে লোকদের জন্য যাদের অন্তর আল্লাহর উপদেশ বাণীতে আরো বেশী কঠোর হয়ে গিয়েছে৷ সে সুস্পষ্ট গোমরাহীর মধ্যে ডুবে আছে৷ ২৩) আল্লাহ সর্বোত্তম বাণী নাযিল করেছেন, এমন একটি গ্রন্থ যার সমস্ত অংশ সামঞ্জস্যপূর্ণ যার মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ের পূনরাবৃত্তি করা হয়েছে৷ এসব শুনে সে লোকদের লোম শিউরে ওঠে যারা তাদের রবকে ভয় করে৷ তারপর তাদের দেহমন বিগলিত হয়ে আল্লাহর স্মরণে প্রতি আকৃষ্ট হয়৷ এটা হচ্ছে আল্লাহর হিদায়াত৷ এর দ্বারা তিনি যাকে ইচ্ছা সঠিক পথে নিয়ে আসেন৷ আর যাকে আল্লাহ নিজেই হিদায়াত দান করেন না তার জন্য কোন হিদায়াতকারী নেই

নামকরনঃ

﴿وَسِيقَ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ إِلَى الْجَنَّةِ زُمَرًا ৭১ এবং ৭৩ নং আয়াতের زُمَرًا মানে দলবদ্ধ থেকে এই সুরার নামকরন করা হয়েছে زُمَرًا

নাযিলের হওয়ার সময় কাল

এ সূরা যে হাবশায় হিজরত করার পূর্বে মক্কী জিন্দেগীর মাঝামাঝি সময়ে নাযিল হয়েছিল , সে ব্যাপারে ১০ নম্বর আয়াত থেকে স্পষ্ট ইংগিত পাওয়া যায়। কোন কোন রেওয়ায়াতে একথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে , হযরত জাফর ইবনে আবী তালেব ও তার সংগী সাথীগণ হাবশায় হিজরতের সংকল্প করলে তাদের সম্পর্কে এ আয়াত নাযিল হয়েছিল (রূহুল মায়ানী , ২৩ তম খণ্ড , পৃষ্ঠা , ২২৬ )

বিষয়বস্তু ও নাযিলের প্রেক্ষাপট

হাবশায় হিজরতের কিছু পূর্বে মক্কার পরিবেশ ছিল জুলুম - নির্যাতন এবং শত্রুতা ও বিরোধিতায় ভরা। ঠিক এ পরিবেশে এ গোটা সূরাটিকে একটি অত্যন্ত মনোজ্ঞ ও মর্মস্পর্শী বক্তৃতারূপে পেশ করা হয়েছে। এটা একটা নসীহত। এতে মাঝে মধ্যে ঈমানদারদের সম্বোধন করা হলেও বেশীরভাগ কুরাইশ গোত্রের কাফেরদের সম্বোধন করা হয়েছে এবং হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতের উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে। তাছাড়া মানুষকে ভ্রান্ত আচরণ পরিত্যাগ করে আল্লাহর রহমতের দিকে ফিরে আসার জন্য আহবান জানানো হয়েছে। এ প্রসংগে ঈমানদারদেরকে পথনির্দেশনা দেয়া হয়েছে যে , যদি আল্লাহর দাসত্বের জন্য একটি জায়গা সংকীর্ণ হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে তাঁর এ পৃথিবী অনেক প্রশস্ত। নিজের দীনকে রক্ষা করার জন্য অন্য কোথাও চলে যাও। আল্লাহ তোমাদের ধৈর্যের পুরস্কার দান করবেন । অন্যদিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলা হয়েছে যে , কাফেরদের জুলুম- নির্যাতন একদিন না একদিন তোমাদেরকে এ পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারবে , এমন দুরাশা কাফেরদের মন থেকে দূর করে দাও এবং পরিস্কারভাবে বলে দাও যে , আমার পথ রোধ করার জন্য তোমরা যা কিছু করতে চাও করো , আমি আমার কাজ চালিয়েই যেতে থাকবো।

ব্যাক্ষাঃ

﴿أَفَمَن شَرَحَ اللَّهُ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ

আল্লাহ তা’আলা যে ব্যক্তির বক্ষ ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন

কোন ব্যাপারে মানুষের বক্ষা উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া মূলত এমন একটি মানসিক অবস্থার নাম , যখন তার মনে উক্ত বিষয় সম্পর্কে কোন দুচিন্তা বা দ্বিধা - দ্বন্দ্ব কিংবা সংশয় থাকে না এবং কোন বিপদের আভাস বা কোন ক্ষতির আশংকাও তাকে ঐ বিষয় গ্রহণ করতে বাধা দিকে পরে না। বরং সে পূর্ণ মানসিক তৃপ্তির সাথে এ সিদ্ধান্ত করে যে , এ জিনিসটি ন্যায় ও সত্য। তাই যাই ঘটুক না কেন আমাকে এর ওপরই চলতে হবে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে কোন ব্যক্তি যখন ইসলামের পথ অবলম্বন করে তখন আল্লাহ ও রসূলের পক্ষ থেকে যে নির্দেশই আসে তা সে অনিচ্ছায় নয় খুশী ও আগ্রহের সাথে মেনে নেয় েএটাকেই বলে আল্লাহ তায়ালার জন্য উন্মুক্ত দিল। فَهُوَ عَلَىٰ نُورٍ مِّن رَّبِّهِ

বং যে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত আলোতে চলছে

অর্থাৎ জ্ঞানের আলো হিসেবে সে আল্লাহর কিতাব ও রসূলের সুন্নাত লাভ করেছেন যার উজ্জ্বল আলোতে সে জীবনে চলার অসংখ্য ছোট ছোট পথের মধ্যে কোনটি ন্যায় ও সত্যের সোজা রাস্তা তা প্রতি পদক্ষেপে স্পষ্ট দেখতে পায় এবং সেই অনুযায়ী সে তার জীবন পরিচালনা করে। فَوَيْلٌ لِّلْقَاسِيَةِ قُلُوبُهُم مِّن ذِكْرِ اللَّهِ ۚ

ধ্বংস সে লোকদের জন্য যাদের অন্তর আল্লাহর উপদেশ বাণীতে আরো বেশী কঠোর হয়ে গিয়েছে৷

যারা রসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরোধিতায় জেদ ও হঠকারিতা করতে একপায়ে দাঁড়িয়ে ছিল এবং এ সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেছিলো যে , কোনমতেই তাঁর কোন কথা মানবে না , আয়াতের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল তাদেরকে সাবধান করা । তাদেরকে এ মর্মে সাবধান করা হয়েছে যে , তোমরা তোমাদের এ জিদ ও হঠকারিতাকে অত্যন্ত গর্বের বিষয় বলে মনে করে থাকো। কিন্তু আল্লাহর যিকির এবং তাঁর পক্ষ থেকে আসা উপদেশ বাণী শুনে বিনম্র হওয়ার পরিবর্তে কেউ যদি আরো বেশী কঠোর হয়ে যায় তাহরে একজন মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় অযোগ্যতা ও দুর্ভাগ্য আর কিছুই নেই। أُولَٰئِكَ فِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ﴾

সে সুস্পষ্ট গোমরাহীর মধ্যে ডুবে আছে৷

মক্কার কাফেররা সহ দুনিয়ায় তাদরে অনুসরনে যারাই এই কোরআনের এবং দাওয়াতের বিরোধিতা করবে তারাই সুস্পষ্ট গোমরাহীর ভিতর ডুবে আছে। আমাদের আশেপাশে যারাই ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান করে তাদের দিকে খেয়াল করলে দেখা যায় যে তারা কি পরিমান জাহালতের ভিতর অবস্থান করছে। ﴿اللَّهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كِتَابًا مُّتَشَابِهًا

আল্লাহ সর্বোত্তম বাণী নাযিল করেছেন, এমন একটি গ্রন্থ যার সমস্ত অংশ সামঞ্জস্যপূর্ণ

ঐ সব বাণীর মধ্যে কোন বৈপরীত্য ও বিরোধ নেই। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত গোটা কিতাব একই দাবী , একই আকীদা - বিশ্বাস এবং চিন্তা ও কর্মের একই আদর্শ পেশ করে। এর প্রতিটি অংশ অন্য সব অংশের এবং প্রতিটি বিষয় অন্য সব বিষয়ের সত্যায়ন , সমর্থন এবং ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষেণ করে । অর্থ ও বর্ণনা উভয় দিক দিয়েই এ গ্রন্থের পূর্ণ মিল ও সামঞ্জস্য বিদ্যমান مَّثَانِيَ تَقْشَعِرُّ مِنْهُ جُلُودُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ

যার মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ের পূনরাবৃত্তি করা হয়েছে৷ এসব শুনে সে লোকদের লোম শিউরে ওঠে যারা তাদের রবকে ভয় করে৷

কোরআনের ভিতর একই ঘটনা এবং একই শব্দগুচ্ছ বিভিন্ন জায়গায় পুনরাবৃত্তি হয়েছে, এই পুনরাবৃত্তির নসিহত সমুহ মুমেন বান্দারা যখন শোনে তখন আল্লাহর ভয়ে তাদের গায়ের লোম শিউরে উঠে। এই আয়াতে ইমানদারের ইমানের হালত পরিক্ষার একটা মাধ্যম বর্ণনা করা হয়েছে তা হলো কোরআনের এই সমস্ত আয়াত তেলোয়াত করলে বা তার অর্থ শুনলে মুমেনের দিল কেঁপে উঠবে অন্তরে আল্লাহর ভয় জাগ্রত হয়ে লোম শিউরে উঠবে। কোরআন শোনা এবং অনুধাবনের পর যদি তা না হয় তাহলে বুঝে নিতে হবে আমি এখনো কোরআনের দাবী মোতাবেক ইমান পূর্ণ করতে পারিনি।

ثُمَّ تَلِينُ جُلُودُهُمْ وَقُلُوبُهُمْ إِلَىٰ ذِكْرِ اللَّهِ তারপর তাদের দেহমন বিগলিত হয়ে আল্লাহর স্মরণে প্রতি আকৃষ্ট হয়৷

আল্লাহর স্বরনে যাদের হৃদয় বিগলিত হয়ে আল্লাহর হুকুমের প্রতি ঝুকে পড়ে আল্লাহর মহব্বত করুনা আর সাহায্য তাদের পিছে পিছে দৌড়াতে থাকে। তাদের প্রতিরোধের ক্ষমতা দুনিয়ার কোন শক্তির থাকেনা। সাহাবায়ে কেরাম যার জলজ্যান্ত উদারহণ।

ذَٰلِكَ هُدَى اللَّهِ يَهْدِي بِهِ مَن يَشَاءُ ۚ وَمَن يُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ﴾

এটা হচ্ছে আল্লাহর হিদায়াত৷ এর দ্বারা তিনি যাকে ইচ্ছা সঠিক পথে নিয়ে আসেন৷ আর যাকে আল্লাহ নিজেই হিদায়াত দান করেন না তার জন্য কোন হিদায়াতকারী নেই৷

এই হেদায়েত আল্লাহ মুহতাজ ব্যক্তিকে দান করেন,যে হেদায়েত পাবার জন্য চেষ্টা করবে আল্লাহ তাকে হেদায়েতের পথ দেখাবেন যেমন আল্লাহ সুরা আনকাবুতের শেষে বলেছেন ﴿وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا যারা আমার জন্য সংগ্রাম- সাধনা করবে তাদেরকে আমি আমার পথ দেখাবো৷ আনকাবুত ৬৯ আয়াত হেদায়েত পাওয়ার চেষ্টা যারা করবে আল্লাহ তাদের হেদায়েত করবেন। আমাদের সামনে এর দুটি উদারহণ আছে (এক) খালিদ ইবনে ওলিদ,হযরত ওমর, হিন্দা,ওয়াহেশী যারা রাসুলুল্লাহর ঘোর শত্রু ছিল তারা হেদায়েত পাওয়ার চেষ্টা করেছে আল্লাহ তাদেরকে ইসলামের দুশমন নবী সাঃ এর শত্রু থেকে সাহাবীতে পরিনত হয়েছে। (দুই) আবু তালিব রাসুলকে এত ভালোবাসলো কিন্ত হেদায়েত পেলোনা কারণ কি? কারণ একটাই হেদায়েত পাবার জন্য আবু তালিব চেষ্টা করেনি।

শিক্ষাঃ

১। নিজের দিলকে ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করা।
২। নিজেকে আল্লাহর হুকুমের অধিনে রেখে ইসলামের আলোর পথে নিজেকে পরিচালিত করা।
৩। দাওয়াত ব্যতিত আল্লাহর দুশমনদের সাথে কোন রকম ধহরম মহরম না রাখা।
৪। কোরআনের আয়াতের অর্থ অনুধাবনের সাথে সাথে নিজের দিলের ভিতর আল্লাহর ভয় পয়দা করা।
৫। হেদায়েত পাওয়ার জন্য সব সময় হেদায়েতের মুখাপেক্ষি হওয়া।

আহবানঃ

সম্মানিত মুহসীন ভাই ও বোনেরা অত্র দারসের শিক্ষনীয় বিষয়গুলো আমরা যাতে আমাদের বাস্তব জীবনে আমলে নিয়ে আসতে পারি আল্লাহ আমাদের সেই তৌফিক দান করুন। আমিন।

দারসুল কোরআন

সুরা নূর

২৭-২৭ নং আয়াত

মোট আয়াত সংখ্যাঃ ৬৪

মোট রুকুর সংখ্যাঃ ০৯

পারা নংঃ১৮

কত মঞ্জিলেঃ ৪র্থ

তারতিব বিন নুযুলঃ ওহীর ধারাবাহিকতায়ঃ

১০২ তম সুরা,এর আগে সুরা হাশর পরে সুরা হাজ্জ।

তারতিব ফিল মুসাহাফঃ কোরআন বিন্যাসের ধারায়

২৪ তম সুরা এর আগে সুরা মুমেনুন পরে সুরা ফুরকান

সহীহ তেলোয়াত


﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّىٰ تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَىٰ أَهْلِهَا ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ﴾


সরল অনুবাদঃ

হে ঈমানদাগণ ! নিজেদের গৃহ ছাড়া অন্যের গৃহে প্রবেশ করো না যতক্ষণ না গৃহবাসীদের সম্মতি লাভ করো এবং তাদেরকে সালাম করো ৷ এটিই তোমাদের জন্য ভালো পদ্ধতি, আশা করা যায় তোমরা এদিকে নজর রাখবে ৷

নামকরণ

ঃ ৫ম রুকুর প্রথম্ অর্থাৎ ৩৫ নং আয়াতের শুরুতেই

﴿اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْض

এর নূর শব্দ থেকে নামটি গৃহীত হয়েছে। নুর মানে আলো,আল্লাহ তায়ালা নিজেকে বিশ্ব জগতের আলো হিসাবে এই আয়াতে চমৎকার ব্যাক্ষা দিয়েছেন।

নাযিলের সময়-কাল

এক কথায় এ সূরাটি বনী মুসতালিক যুদ্ধের সময় মদিনায় নাযিল হয়, এ বিষয়ে সবাই একমত । কুরআনের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, হযরত আয়েশার (রা) বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের ঘটনা প্রসংগে এটি নাযিল হয় । (দ্বিতীয় ও তৃতীয় রুকুতে এ ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে । আর সমস্ত নির্ভরযোগ্য বর্ণনা অনুযায়ী বনীল মুসতালিক যুদ্ধের সফরের মধ্যে এ ঘটনাটি ঘটে ।কিন্তু এ যুদ্ধটি ৫ 2 হিজরী সনে আহযাব যুদ্ধের আগে না ৬ হিজরীতে আহযাব যুদ্ধের পরে সংঘটিত হয় সে ব্যাপারে মতবিরোধ দেখা যায়, ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, আহযাব যুদ্ধ ৫ হিজরীর শওয়াল মাসের ঘটনা এবং বনীল মুসতালিকের যুদ্ধ হয় ৬ হিজরীর শাবান মাসে । এ প্রসংগে হযরত আয়েশা (রা) ও অন্যান্য লোকদের থেকে যে অসংখ্য নির্ভরযোগ্য হাদীস বর্ণিত হয়েছে সেগুলো এর সমর্থন করে । সেগুলো থেকে জানা যায়, মিথ্যা অপবাদের ঘটনার পূর্বে হিজাব বা পরদার বিধান নাযিল হয় আর এ বিধান পাওয়ার যায় সূরা আহযাবে । এ থেকে জানা যায়, সে সময় হযরত যয়নবের (রা) সাথে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল এবং এ বিয়ে ৫ হিজরীর যিলকদ মাসের ঘটনা । সূরা আহযাবে এ ঘটনারও উল্লেখ পাওয়া যায় । এ ছাড়া এ হাদীসগুলো থেকে একথাও জানা যায় যে, হযরত যয়নবের (রা) বোন হামনা বিনতে জাহশ হযরত আয়েশার (রা) বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়ানোয় শুধুমাত্র এ জন্য অংশ নিয়েছিলেন যে, হযরত আয়েশা তাঁর বোনের সতিন ছিলেন । আর একথা সুস্পষ্ট যে, বোনের সতিনে বিরুদ্ধে এ ধরনের মনোভাব সৃষ্টি হবার জন্য সতিনী সম্পর্ক শুরু হবার পর কিছুকাল অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। এসব সাক্ষ ইবনে ইসহাকের বর্ণনাকে শক্তিশালী করে দেয় ।

ঐতিহাসিক পটভূমি

বদর যুদ্ধে জয়লাভ করার পর আরবে ইসলামী আন্দোলনের যে উত্থান শুরু হয় খন্দকের যুদ্ধ পর্যন্ত পৌঁছুতে পৌঁছুতেই তা এত বেশী ব্যাপকতা লাভ করে যার ফলে মুশরিক, ইহুদী, মুনাফিক ও দোমনা সংশয়ী নির্বিশেষে সবাই একথা অনুভব করতে থাকে যে, এ নব উত্থিত শক্তিটিকে শুধুমাত্র অস্ত্র ও সমর শস্তির মাধ্যমে পরাস্ত করা যেতে পারে না । খন্দকের যুদ্ধে তারা এক জোট হয়ে দশ হাজার সেনা নিয়ে মদীনা আক্রমণ করেছিল । কিন্তু মদীনা উপকণ্ঠে এক মাস ধরে মাথা কুটবার পর শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ মনোরথ হয়ে চলে যায় তাদের ফিরে যাওয়ার সাথে সাথেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করে দেনঃ“এ বছরের পর কুরাইশরা আর তোমাদের ওপর হামলা করবে না বরং তোমরা তাদের ওপর হামলা করবে। রসূল (সা)-এর এ উক্তি দ্বারা প্রকারান্তরে একথাই জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, ইসলাম বিরোধী শক্তির অগ্রগতির ক্ষমতা নিশেষ হয়ে গেছে,এবার থেকে ইসলাম আর আত্মরক্ষার নয় বরং অগ্রগতির লড়াই লড়বে এবং কুফরকে অগ্রগতির পরিবর্তে আত্মরক্ষার লড়াই লড়তে হবে।

প্রধান ঘটনা ও প্রেক্ষাপট

• মিথ্যা অপবাদ (ইফকের ঘটনা): বনু মুসতালিক যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে হযরত আয়েশা (রা.) হারিয়ে যাওয়া হার খুঁজতে গিয়ে কাফেলা থেকে পেছনে পড়ে যান। পরবর্তীতে এক সাহাবির সাথে তিনি মদিনায় পৌঁছালে মুনাফিক ও কিছু লোক তাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা রটায়। • হযরত আয়েশার পবিত্রতা ঘোষণা: সুরাটির মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা হযরত আয়েশা (রা.)-এর সম্পূর্ণ পবিত্রতা ঘোষণা করেন এবং অপবাদকারীদের মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করেন। •

কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তুঃ

• মুনাফিকরা মুসলমানদেরকে এমন এক ময়দানে পরাজিত করতে চাচ্ছিল যেটা ছিল তাদের প্রাধান্যের আসল ক্ষেত্র । আল্লাহ তাদের চরিত্রে হননমূলক অপবাদ রটনার অভিযানের বিরুদ্ধে একটি ক্রুদ্ধ ভাষণ দেবার বা মুসলমানদেরকে পাল্টা আক্রমণে উদ্বুদ্ধ করার পরিবর্তে মুসলমানদেরকে এ শিক্ষা দেবার প্রতি তাঁর সার্বিক দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন যে, তোমাদের নৈতিক অংগনে যেখানে যেখানে শূন্যতা রয়েছে সেগুলো পূর্ণ কর এবং এ অংগনকে আরো বেশী শক্তিশালী করো । একটু আগেই দেখা গেছে যয়নবের (রা) বিয়ের সময় মুনাফিক ও কাফেররা কী হাংগামাটাই না সৃষ্টি করেছিল । অথচ সূরা আহযাব বের করে পড়লে দেখা যাবে সেখানে ঠিক সে হাংগামার যুগেই সামাজিক সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত নির্দেশগুলো দেয়া হয়ঃ • একঃ নবী করীমের (সা) পবিত্র স্ত্রীগণকে হুকুম দেয়া হয়ঃ নিজেদের গৃহমধ্যে মর্যাদা সহকারে বসে থাকো, সাজসজ্জা করে বাইরে বের হয়ো না এবং ভিন পুরুষদের সাথে কথা বলার প্রয়োজন হলে বিনম্র স্বরে কথা বলো না, যাতে কোন ব্যক্তি কোন অবাঞ্ছিত আশা পোষণ না করে বসে । ( ৩২ ও ৩৩ আয়াত) • দুইঃ নবী করীমের (সা) গৃহে ভিন পুরুষদের বিনা অনুমতিতে প্রবেশ বন্ধ করে দেয়া হয় এবং নির্দেশ দেয়া হয় 3

ব্যাক্ষাঃ

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ

হে ঈমানদাগণ ! নিজেদের গৃহ ছাড়া অন্যের গৃহে প্রবেশ করো না যতক্ষণ না গৃহবাসীদের সম্মতি লাভ করো। আয়াতের এই অংশের মর্মার্থ অনুধাবনের জন্য দুটি বিষয় ভালোভাবে অনুধাবন প্রয়োজন। একঃ অপবাদের ঘটনার পরপরই এ বিধান বর্ণনা করা পরিষ্কারভাবে একথাই ব্যক্ত করে যে, রসূলের স্ত্রীর ন্যায় মহান ও উন্নত ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে এত বড় একটি ডাহা মিথ্যা অপবাদের এভাবে সমাজের অভ্যন্তরে ব্যাপক প্রচারলাভকে আল্লাহ আসলে একটি যৌন কামনাতাড়িত পরিবেশের উপস্থিতির ফল বলে চিহ্নিত করেছেন। আল্লাহর দৃষ্টিতে এ যৌন কামনা তাড়িত পরিবেশের বদলানর একমাত্র উপায় এটাই ছিল যে, লোকদের পরস্পরের গৃহে নিসংকোচে আসা যাওয়া বন্ধ করতে হবে, অপরিচিত নারী-পুরুষদের পরস্পর দেখা-সাক্ষাত ও স্বাধীনভাবে মেলামেশার পথ রোধ করতে হবে, মেয়েদের্ একটি অতি নিকট পরিবেশের লোকজন ছাড়া গায়ের মুহাররাম আত্মীয়-স্বজন ও অপরিচিতদের সামনে সাজসজ্জা করে যাওয়া নিষিদ্ধ করতে হবে, পতিতাবৃত্তির পেশাকে চিরতরে বন্ধ করে দিতে হবে, পুরুষদের ও নারীদের দীর্ঘকাল অবিবাহিত রাখা যাবে না, এমনকি গোলাম ও বাঁদীদেরও বিবাহ দিতে হবে। অন্য কথায় বলা যায়, মেয়েদের পরদাহীনতা ও সমাজে বিপুল সংখ্যক লোকের অবিবাহিত থাকাই আল্লাহর জ্ঞান অনুআয়ী এমন সব মৌলিক কার্যকারণ যেগুলোর মাধ্যমে সামাজিক পরিবশে একটি অননুভূত যৌন কামনা সর্বক্ষণ প্রবাহমান থাকে এবং এ যৌন কামনার বশবর্তী হয়ে লোকদের চোখ, কাণ, কণ্ঠ, মন-মানস সবকিছুই কোন বাস্তব বা কাল্পনিক কেলেংকারিতে (Scandal) জড়িত হবার জন্য সবসময় তৈরী থাকে। এ দোষ ও ত্রুটি সংশোধন করার জন্য আলোচ্য পরদার বিধিসমূহের চেয়ে বেশী নির্ভুল, উপযোগী ও প্রভাবশালী অন্য কোন কর্মপন্থা আল্রাহর জ্ঞান-ভাণ্ডারে ছিল না। নয়তো তিনি এগুলো বাদ দিয়ে অন্য বিধান দিতেন। দুইঃ এ সুযোগে দ্বিতীয় যে কথাটি বুঝে নিতে হবে সেটি হচ্ছে এই যে, আল্লাহর শরীয়াত কোন অসৎকাজ নিছক হারাম করে দিয়ে অথবা তাকে অপরাধ গন্য করে তার জন্য শাস্তি নির্ধারিত করে দেয়াই যথেষ্ট মনে করে না বরং যেসব কার্যকারণ কোন ব্যক্তিকে ঐ অসৎকাজে লিপ্ত হতে উৎসাহিত করে অথবা তার জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দেয় কিংবা তাকে তা করতে বাধ্য করে, সেগুলোকেও নিশ্চিহ্ন করে দেয়। তাছাড়া শরীয়াত অপরাধের সাথে সাথে অপরাধের কারণ, অপরাধের উদ্যোক্তা ও অপরাধের উপায়-উপকরণাদির ওপরও বিধি নিষেধ আরোপ করে। এভাবে আসল অপরাধের ধারে কাছে পৌছার আগেই অনেক দূর থেকেই মানুষকে রুখে দেয়া হয়। মানুষ সবসময় অপরাধের কাছ দিয়ে ঘোরাফেরা করতে থাকবে এবং প্রতিদিন পাকড়াও হতে ও শাস্তি পেতে থাকবে, এটাও সে পছন্দ করে না। সে নিছক একজন অভিযোক্তাই (Prosecutor) নয় বরং একজন সহানুভূতিশীল সহযোগী, সংস্কারকারী ও সাহায্যকারীও। তাই সে মানুষকে অসৎকাজ থেকে নিষ্কৃতিলাভের ক্ষেত্রে সাহায্য করার উদ্দেশ্যই সকল প্রকার শিক্ষামূলক, নৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা অবলম্বন করে। ''লোকদের গৃহে প্রবেশ করো না যতক্ষণ না তাদেরকে অন্তরংগ করে নেবে অথবা তাদের সম্মতি জেনে নেবে।'' অর্থাৎ একথা না জেনে নেবে যে, গৃহমালিক তোমার আসাকে অপ্রীতিকর বা বিরক্তিকর মনে করছে না এবং তার গৃহে তোমার প্রবেশকে সে পছন্দ করছে। حَتَّىٰ تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَىٰ أَهْلِهَا

ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ

যতক্ষণ না গৃহবাসীদের সম্মতি লাভ করো এবং তাদেরকে সালাম করো ৷এটিই তোমাদের জন্য ভালো পদ্ধতি, আশা করা যায় তোমরা এদিকে নজর রাখবে ৷ জাহেলী যুগে আরববাসীদের নিয়ম ছিল, তারা সুপ্রভাত, শুভ সন্ধ্যা বলতে বলতে নিসংকোচ সরাসরি একজন অন্যজনের গৃহে প্রবেশ করে যেতো। অনেক সময় বহিরাগত ব্যক্তি গৃহ মালিক ও তার বাড়ির মহিলাদেরকে বেসামাল অবস্থায় দেখে ফেলতো। আল্লাহ এর সংশোধনের জন্য্ এ নীতি নির্ধারণ করেন যে, প্রত্যেক ব্যক্তির যেখানে সে অবস্থান করে সেখানে তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা 4 (Privacy) রক্ষা করার অধিকার আছে এবং তার সম্মতি ও অনুমতি ছাড়া তার এ গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ করা অন্য ব্যক্তির জন্য জায়েয নয়। এ হুকুমটি নাযিল হবার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমাজে যেসব নিয়ম ও রীতিনীতির প্রচলন করেনঃ একঃ নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যক্তিগত গোপনীয়তার এ অধিকারটিকে কেবলমাত্র গৃহের চৌহদ্দীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং একে একটি সাধারণ অধীকার গণ্য করেন। এ প্রেক্ষিতে অন্যের গৃহে উঁকি ঝুঁকি মারা, বাহির থেকে চেয়ে দেখা এমনি অন্যের চিঠি তার অনুমতি ছাড়া পড়ে ফেলা নিষিদ্ধ। হযরত সওবান (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আজাদ করা গোলাম) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সা) বলেনঃ ''দৃষ্টি যখন একবার প্রবশ করে গেছে তখন আর নিজের প্রবেশ করার জন্য অনুমতি নেবার দরকার কি৷'' (আবু দাউদ) হযরত হুযাইল ইবনে শুরাহবীল বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালামের কাছে এলেন এবং ঠিক তাঁর দরজার ওপর দাঁড়িয়ে অনুমতি চাইলেন। নবী (সা) তাকে বললেন, ''পিছনে সরে গিয়ে দাঁড়াও, যাতে দৃষ্টি না পড়ে সে জন্যই তো অনুমতি চাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।' (আবু দাউদ) নবী করীমের (সা) নিজের নিয়ম ছিল এই যে, যখন কারোর বাড়িতে যেতেন, দরজার ঠিক সামনে কখনো দাঁড়াতেন না। কারণ সে যুগে ঘরের দরজায় পরদা লটকানো থাকত না। তিনি দরজার ডান পাশে বা বাম পাশে দাঁড়িয়ে অনুমতি চাইতেন। (আবু দাউদ) রসূলুল্লাহর (সা) খাদেম হযরত আনাস বলন, এক ব্যক্তি বাইরে থেকে রসূলের (সা) কামরার মধ্যে উঁকি দিলেন। রসূলুল্লাহর (সা) হাতে সে সময় একটি তীর ছিল। তিনি তার দিকে এভাবে এগিয়ে এলেন যেন তীরটি তার পেটে ঢুকিয়ে দেবেন। (আবু দাউদ) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন, নবী (সা) বলেছেনঃ ''যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের অনুমতি ছাড়া তার পত্রে চোখ বুলালো সে যেন আগুনের মধ্যে দৃষ্টি ফেলছে।'' (আবুদ দাউদ) বুখারী ও মুসলিমে উদ্ধৃত হয়েছে,নবী (সা) বলেছেনঃ ''যদি কোন ব্যক্তি তোমার গৃহে উঁকি মারে এবং তুমি একটি কাঁকর মেরে তার চোখ কানা করে দাও, তাহলে তাতে কোন গোনাহ হবে না।'' এ বিষয়বস্তু সম্বলিত অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছেঃ ''যে ব্যক্তি কারোর ঘরে উঁকি মারে এবং ঘরের লোকেরা তার চোখ ছেঁদা করে দেয়, তবে তাদের কোন জবাবদিহি করতে হবে না।'' দুইঃ ফকীহগণ শ্রবণ শক্তিকেও দৃষ্টিশক্তির হুকুমের অন্তরভূক্ত করেছেন। যেমন অন্ধ ব্যাক্তি যদি বিনা অনুমতিতে আসে তাহলে তার দৃষ্টি পড়বে না ঠিকই কিন্তু তার কান তো গৃহবাসীদের কথা বিনা অনুমতিতে শুনে ফেলবে । এ জিনিসটিও দৃষ্টির মতো ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারে অবৈধ হস্তক্ষেপ। তিনঃ কেবলমাত্র অন্যের গৃহে প্রবেশ করার সময় অনুমতি নেবার হুকুম দেয়া হয়নি। বরং নিজের মা-বোনদের কাছে যাবার সময়ও অনুমতি নিতে হবে। এ ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলো, আমি কি আমার মায়ের কাছে যাবার সময়ও অনুমতি চাইবো৷ জবাব দিলেন, হাঁ। সে বললো, আমি ছাড়া তাঁর সেবা কারার আর কেউ নেই। এক্ষেত্রে কি আমি যতবার তাঁর কাছে যাবো প্রত্যেকবার অনুমতি নেবো৷ জবাব দিলেন, ''তুমি কি তোমার মাকে উলংগ অবস্থায় দেখতে পছন্দ কর৷'' (ইবনে জারীর এ মুরসাল হাদীসটি আতা ইবনে ইয়াসার থেকে বর্ণনা করেছেন) আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের উক্তি হচ্ছে, ''নিজেদের মা-বোনদের কাছে যাবার সময়ও অনুমতি নিয়ে যাও।'' (ইবনে কাসীর) বরং ইবনে মাসউদ তো বলেন, নিজের ঘরে নিজের স্ত্রীর কাছে যাবার সময়ও অন্ততপক্ষে গলা খাঁকারী দিয়ে যাওয়া উচিত। তাঁর স্ত্রীর যয়নবের বর্ণনা হচ্ছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ যখনই গৃহে আসতে থাকেন তখনই আগেই এমন কোন আওয়াজ করে দিতেন যাতেন তিনি আসছেন বলে জানা যেতো। তিনি হঠাৎ ঘরের মধ্যে এসে যাওয়া পছন্দ করতেন না। (ইবনে জারীর চারঃ শুধুমাত্র এমন অবস্থায় অনুমতি চাওয়া জরুরী নয় যখন কারোর ঘরে হঠাৎ কোন বিপদ দেখা দেয়া। যেমন, আগুন লাগে অথবা কোন চোর ঢোকে। এ অবস্থায় সাহায্য দান করার জন্য বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করা যায়। পাঁচঃ প্রথম প্রথম যখন অনুমতি চাওয়ার বিধান জারি হয় তখন লোকেরা তার নিয়ম কানুন জানতো না। একবার এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসে এবং দরজা থেকে চিৎকার করে বলতে থাকে ( আমি কি ভেতরে ঢুকে যাবো৷) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বাঁদী রওযাহকে বলেন, এ ব্যক্তি অনুমতি চাওয়ার নিয়ম জানে না। একটু উঠে গিয়ে তাকে বলে এস,(আসসালামু আলাইকুম, আমি কি ভিতরে আসতে পারি৷) বলতে হবে। (ইবনে জারির ও আবু দাউদ) জাবের ইবনে আবদুল্লাহ বলে, আমি আমার বাবার ঋণের ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গেলাম এবং দরজায় করাঘাত করলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কে৷ আমি বললাম, আমি । তিনি দু-তিনবার বললেন, ''আমি৷ আমি৷' অর্থাৎ এখানে আমি বললে কে কি বুঝবে যে, তুমি কে৷ (আবু দাউদ) কালাদাহ ইবনে হাম্বল নামে এক ব্যক্তি কাজে নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গেলেন। সালাম 5 ছাড়াই এমনই সেখানে গিয়ে বসলেন। তিনি বললেন, বাইরে যাও এবং আস্‌সালামু আলাইকুম বলে ভেতরে এসো। (আবু দাউদ) অনুমতি চাওয়ার সঠিক পদ্ধতি ছিল, মানুষ নিজের নাম বলে অনুমতি চাইবে। হযরত উমরের (রা) ব্যাপারে বর্ণিত আছে নবী করীমের (সা) খিদমতে হাজির হয়ে তিনি বলতেনঃ ''আসসালামু আলাইকুম, হে আল্লাহর রসূল ! উমর কি ভেতরে যাবে৷''(আবু দাউদ) অনুমতি নেবার জন্য নবী করীম (সা) বড় জোর তিনবার ডাক দেবার সীমা নির্দেশ করেছেন এবং বলেছেন যদি তিনবার ডাক দেবার পরও জবাব না পাওয়া যায়, তাহলে ফিরে যাও। (বুখারী মুসলিম, আবু দাউদ) নবী (সা) নিজেও এ পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। একবার তিনি হযরত সা'দ ইবনে উবাদার বাড়ীতে গেলেন এবং আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ বলে দু'বার অনুমতি চাইলেন । কিন্তু ভেতর থেকে জবাব এলো না । তৃতীয় বার জবাব না পেয়ে তিনি ফিরে গেলেন । হযরত সা'দ ভেতর থেকে দৌড়ে এলেন এবং বললেনঃ হে আল্লাহর রসূল ! আমি আপনার আওয়াজ শুনছিলাম । কিন্তু আমার মন চাচ্ছিল আপনার মুবারক কন্ঠ থেকে আমার জন্য যতবার সালাম ও রহমতের দোয়া বের হয় ততই ভালো, তাই আমি খুব নীচু স্বরে জবাব দিচ্ছিলাম । ( আবু দাউদ ও আহমাদ) এ তিনবার ডাকা একের পর এক হওয়া উচিত নয় বরং একটু থেমে হতে হবে। এর ফলে ঘরের লোকেরা যদি কাজে ব্যস্ত থাকে এবং সে জন্য তারা জবাব দিতে না পারে তাহলে সে কাজ শেষ করে জবাব দেবার সুযোগ পাবে। ছয়ঃ গৃহমালিক বা গৃহকর্তা অথবা এমন এক ব্যক্তির অনুমতি গ্রহণযোগ্য হবে যার সম্পর্কে মানুষ যথার্থই মনে করবে যে, গৃহকর্তার পক্ষ থেকে সে অনুমতি দিচ্ছে । যেমন, গৃহের খাদেম অথবা কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তি । কোন ছোট শিশু যদি বলে, এসে যান, তাহলে তার কথায় ভেতর প্রবেশ করা উচিত নয় । সাতঃ অনুমতি চাওয়ার ব্যাপারে অযথা পীড়াপীড়ি করা অথবা অনুমতি না পাওয়ায় দরজার ওপর অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জায়েয নয়। যদি তিনবার অনুমতি চাওয়ার পর গৃহকর্তার পক্ষ থেকে অনুমতি না পাওয়া যায় বা অনুমতি দিতে অস্বীকার জানানো হয়, তাহলে ফিরে যাওয়া উচিত ।

শিক্ষাঃ

১। কারো ঘরে প্রবেশ করার জন্য অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। ২।এর উপকারিতা বহুবিধ। যেমন, এর ফলে অন্যের ঘরে অনাবশ্যক প্রবেশ বা অসময় প্রবেশ বন্ধ হয়ে যাবে। এরূপ প্রবেশের ফলে গৃহবাসীদের কষ্ট হয়ে থাকে। তাছাড়া বিনা অনুমতিতে প্রবেশের ফলে অন্যায়-অশ্লীল কাজ সংঘটিত হওয়া বা তার বিস্তার ঘটার সম্ভাবনা থাকে। অনুমতি গ্রহণ দ্বারা তারও রোধ হবে। অনুমতি কিভাবে গ্রহণ করতে হবে আয়াতে তাও শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।

আহবানঃ

সম্মানিত ভাই/বোনেরা আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক নির্ধারিত ফরজ হুকুম পর্দা,আমাদের পারিবারিক জীবন হতে সর্ব প্রথম এর আমল শুরু করা জরুরী। আমরা আমাদের সন্তান,ভাই বোন হিতাকাংখী সবাইকে এ বিষয়ে যে কোন কৌশলে দাওয়াত পৌছে দেয়া এখন সময়ের দাবী,লেখার ভিতর কো ভূলত্রুটি হলে মার্জনার সাথে দেখবেন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে পর্দার বিধান নিজের পরিবারের সমাজের ভিতর প্রতিষ্ঠার তৌফিক আল্লাহ দান করুন। আমিন

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

<marquee>দারসুল কোরআন</marquee>

1 সুরা যুমর দারস মোট আয়াত: ৭৫টি মোট ৮টি রুকু আছে। ...